আমার রাজনীতির প্রথম পাঠ
জীবনের প্রথম দিকে রাজনীতি বুঝতাম না। শুধু
বুঝতাম নৌকা ধানের, শীষ, লাঙ্গল ইত্যাদি ইত্যাদি। মনের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে বেশ খটকা
লাগতো। যখন ইলেকশন আসতো, মারামারি ভোটকেন্দ্র দখল, ভোটের বাক্স ছিনতাই, গোলাগুলি ইত্যাদি
আরো কত কিছু। তবে আমার বাবার মুখে অনেকবার শুনেছিলাম, মাওলানা ভাসানীর কথা। হোসেন শহীদ
সোহরাওয়ার্দী, ফজলুল হক ও মনি সিং এই ধরনের নাম। শুধু মার্কা আর মিছিল ছাড়া কিছুই
বুঝতাম না, চিনতামও না। আমরা থাকতাম নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকায়। জায়গাটার
নাম আজিবপুর। প্রতি রবিবার মুন লাইট, সারুলিয়া সিনেমা হল ও নারায়ণগঞ্জের ঝুমুর সিনেমা
হলে, নতুন ছবি মুক্তি পেতো। আমরা এটাকে বই বলতাম, আজ বই মুক্তি হবে। রবিবার দিনগুলো
সাপ্তাহিক ছুটি থাকতো। আমরা সপরিবারে অর্থাৎ ফ্যামিলির সবাইকে নিয়ে বই দেখতে যেতাম।
বইগুলো সাধারণত সাদা কালো হতো। মাঝে মাধ্যে দুই একটা নাচের দৃশ্য রঙিন দেখাতো।
আমার বাবা খুব মিশুক প্রকৃতির ছিল। ওনার প্রচুর
বন্ধু ছিল। সদানন্দ কাকা, আব্দুল হাকিম কাকা সহ অনেকেই। তারা সবাই মিলে, অর্থাৎ আমরা
একসাথে সিনেমা দেখতাম। এই সিনেমা দেখার আনন্দই ছিল একেবারে ভিন্ন ও খুবই আনন্দের। সিনেমা
দেখার পর কোন একটা রেস্টুরেন্টে বসে সবাই হৈ হুল্লোড় করে খাওয়া-দাওয়া করতাম। তারপর,
রিক্সা নিয়ে বাসায় ফিরতাম। আমি যেহেতু ছোট ছিলাম, তাই কারো কোলে অথবা রিকশার দুইজনের
মাঝখানে উপরে বসতাম। এতে খুব আনন্দ পেতাম, কারণ উপর দিয়ে সামনের অনেক দৃশ্য দেখতে
পেতাম। এভাবেই চলতো তখনকার সময়ের সবকিছু। মোবাইল ফোন, ডিস এন্টেনা, রঙ্গিন টিভি, এগুলো
কিছুই ছিল না। আমাদের বাসায় একটা সাদাকালো টিভি ছিল। আরেকটা খবর ও গান শোনার জন্য
টেপ রেকর্ডার ছিল। এই টেপ রেকর্ডার ব্যাটারি দিয়ে চালাতে হতো। তারপরও সেই সময়টা আনন্দের
শেষ ছিল না । আমার প্রচুর বন্ধু ছিল। বিভিন্ন মাঠে গিয়ে খেলাধুলা করতাম, আর নিয়মিত
স্কুলে যেতাম। আমার স্কুলের নাম ছিলো, সিদ্ধিরগঞ্জ রেবতী মোহন পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়।
ঐ স্কুলে আমি ৭ম শ্রেণী পর্যন্ত পড়েছি । আমার বাবা বিজেএমসি এর অধীনে সর্বশেষ মনেয়ার
জুট মিলে পিএফ একাউন্টস অফিসার ছিল। ফলে জন্মের পর থেকে দীর্ঘ একটা সময় ওখানে কাটিয়েছি।
মাঝখানে পাবিবারিক অনেক উত্থান-পতন হয়েছে। আমরা সিদ্ধিরগঞ্জ ছেড়ে চলে আসি, গাজীপুরের
শ্রীপুর নিজেদের বাড়িতে।
শ্রীপুর থানা রোডে ছোট্ট একটি বইয়ের দোকান,
নাম ”স্টুডেন্ট লাইব্রেরী”। আমি ওখানে একটি বলপেন ও এক দিস্তা নিউজ প্রিন্টের কাগজ
কিনতে গিয়েছিলাম। দোকানটিতে বই ও কাগজে ঠাসা কয়েকটি সেলফ দেখলাম। পাশে কয়েক জন বই পড়ছে,
কেউ দাঁড়িয়ে কথা বলছে। শুনলাম সবাই শ্রীপুর ডিগ্রী কলেজে পড়ছে। আমি মাত্র নিউ টেন
(দশম শ্রেণীতে)। দোকানদার নিজেও স্টুডেন্ট ও কলেজে পড়ে, শুনে খুবই ভালো লাগলো। আমি
বলপেন ও কাগজ কিনে চলে গেলাম।
কিছু দিন পর, আমি একটি বই কিনতে এলাম, স্টুডেন্ট
লাইব্রেরীতে। এ সময় পূর্বের দেখা মানুষ গুলোকেই দেখতে পেলাম। এবার সবার সাথে পরিচয়
হলো। লাইব্রেরীটি যিনি পরিচালনা করেন, তার নাম মোয়াজ্জেম হোসেন, বাকিরা পর্যায়ক্রমে,
খন্দকার আবুল মহসীন, ইকবাল হাসান কাজল, খন্দকার মাজহারুল হক বাদল ও সোহরাব হোসেন। তারা
আমাকে একটি পাঠচক্রে আমন্ত্রণ জানান ও দেয়াল পত্রিকার জন্য লেখা দিতেও বলেন। শুনে আমার
খুব ভালো লাগলো, কারণ আমি কবিতা ও ছোট গল্প লিখতাম। ফলে, এমন সুন্দর একটি অফার পাব,
যা ভাবতেই পারিনি। আমি খুশি মনে চলে গেলাম।
এরই মাঝে আমি ৫টাকা দিয়ে একটি ফর্ম ফিলাপ
করে একটি ছাত্র সংগঠনে যুক্ত হলাম । এর নাম “গণতান্ত্রিক ছাত্র ইউনিয়ন”। জীবনের প্রথম
কোন ছাত্র সংগঠনের সদস্য হলাম। ছাত্র রাজনীতির বিন্দুটি এঁকে ছিলাম এখানেই। তারপর থেকে
তাদের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে শুরু করলাম। তখনও রাজনীতির কিছুই বুঝে উঠতে পারিনি। মাঝে
মধ্যে পাঠ চক্র ও ছোট ছোট মিছিলে আমাকে নিত। আমিও খুবই আনন্দ পেতাম। তবে দেয়াল পত্রিকায়
লিখতাম নিয়মিত। এটি শ্রীপুর রেলওয়ে স্টেশনের একটি ওয়ালে লাগানো হতো। সে সময়ে কার্ল
মাক্স, এঙ্গেলস, লেনিন, মাও সেতুং, হোচিমিন বা আরো কত কত কঠিন নাম গুলো মাঝে মাঝে,
আমার প্রিয় বড় ভাই ও প্রিয় কমরেডদের মুখে শুনতাম। আর তাদের হাতে কার্ল মাক্স ও বিপ্লরের
উপর লেখা, কি কি জানি কঠিন কঠিন শব্দে নাম লিখা, মোটা মোটা বই দেখতাম। আমার রাজনীতির
হাতে খড়ি ছিলো, স্টুডেন্ট লাইব্রেরী থেকে। আমার প্রিয় বড় ভাই, খন্দকার আবুল মহসীন,
মোয়াজ্জেম হোসেন, ইকবাল হাসান কাজল, খন্দকার মাজহারুল হক বাদল ও সোহরাব হোসেন ভাই এর
হাত ধরে। পরবর্তীতে পরিচয় হয় গাজীপুরের আনোয়ার ভাই, ইকবাল ভাই, মজিদ ভাই সহ আরো অনেকের
সাথে। উল্লেখ্য আমি ছাড়াও আমার দুই জন খুব ভালো বন্ধু ছিল। একজন জাবেদ (সে পরর্তীতে
শ্রীপুর ডিগ্রী কলেজের ভিপি নির্বাচিত হয়), অন্যজন চঞ্চল। তাদের দুই জনের খুবই সহযোগীতা
পেয়েছি, যা উল্লেখ করার মতো।
আমার রাজনীতির তিনটি আশ্রয় স্থল ছিলো। যেখানে
অবাদে যাতায়ত করতাম। স্টুডেন্ট লাইব্রেরী, বাদল ভাইদের বাড়ি ও মহসীন ভাইদের ঔষধের দোকান।
আমরা বাদল ভাইদের বাড়িতে সব সময় যাতায়াত করতাম। প্রায়ই রাতে থেকে যেতাম। বাদল ভাইয়ের
রুমটি ছিলো লাইব্রেরীর মতো। চারদিকে ছড়ানো বইয়ের স্তুপ ও ঘরের দেয়ালে শোভা পেতো শুকান্তর
লেখা মোটা অক্ষরে কবিতার লাইনগুলো। বাদল ভাইয়ের মা অর্থাৎ আমাদের প্রিয় খালাম্মা, আমাদের
প্রতি ছিলো খুবই আন্তরিক। দিনে রাতে যখনই ঐ বাড়িতে যেতাম। খালাম্মা আমাদের গরম ভাত
রান্না করে খাওয়াতো। বাদল ভাইয়ের বাবা ছিলেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। সেই
বাড়ির প্রতিটি মানুষই ছিলো খুবই ভালো মনের। খালাম্মা আজ আমাদের মাঝে নেই। একজন সাধারণ
রাজনৈতিক কর্মী হিসাবে, আমি ঋণী হয়ে থাকলাম।
